ব্যক্তি পরিচিতিঃ

 

১৯৪৫ সালের ৩ মে আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ছিলেন একজন  মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও গণমানুষের অতি কাছের মানুষ। গরিব-দুঃখী ও মেহনতি মানুষের পরম বন্ধু। তাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছিল সমগ্র চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের রাজনীতি। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আমৃত্যু আনোয়ারা কর্ণফুলীর মানুষের পাশে নিজেকে উজাড় করে গেছেন। নীতি- নৈতিকতা ছিল তাঁর অনন্য সম্পদ। সাধারণ জনগণ ছিলেন তাঁর আত্মার আত্মীয়, জয় করেছেন তাদের মন, ভালোবাসা। বাঙালির সম্মান, গৌরব, মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধিতে যেসব রাজনীতিবিদ নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে একজন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ছিলেন একজন বনেদি ও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। একজন দেশবরেণ্য শিল্পপতি হওয়া সত্ত্বেও এবং দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করার পরও নিজেকে একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন বিধায় তিনি একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করতেন। তাঁর কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল।

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ছিলেন একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ ও চার বারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য ছিলেন। নবম জাতীয় সংসদে তিনি পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন।

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ব্যক্তি জীবনে ৩ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের জনক। তিনি একজন সমাজহিতৈষী, দানবীর ও জনদরদী ছিলেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি হাইলধর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বাধীনতার পরেও তিনি হাইলধর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং থানা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। 

 

শিক্ষাক্ষেত্রে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর অবদানঃ

 

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়ার বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। আনোয়ারা ডিগ্রী কলেজ, হাইলধর বশরুজ্জামান স্মৃতি শিক্ষা কেন্দ্র, বরুমছড়া শহীদ বশরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়, আনোয়ারা যুগেস চন্দ্র মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, ঝি.বা.শি উচ্চ বিদ্যালয়সহ আরো অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বটতলী মোহছেন আউলিয়া ডিগ্রী কলেজ, চন্দনাইশ বরমা কলেজ, এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ, এ.জে.চৌধুরী ডিগ্রী কলেজ, রায়পুর উপক‚লীয় উচ্চ বিদ্যালয়সহ আনোয়ারা পশ্চিম পটিয়ার ও চট্টগ্রামে অনেক স্কুল কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদাতা সদস্য।

 

 

অনুপ্রাণনাঃ

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর জীবনী থেকে নতুন প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে। বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ছিলেন এমনি এক অসাধারণ মহাপুরুষ। যার সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছে বিশাল এক প্রাণবন্ত জগৎ। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে সংগঠন ও জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। জীবনে অনেকবার মন্ত্রিত্বের সুযোগ পেয়েও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুতি হয়নি। তিনি অত্যন্তদূরদর্শী ও বিচক্ষণ রাজনীতির ধারক ছিলেন। চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি এক উজ্জল জ্যোতিষ্ক। তিনি চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগের এক অনন্য কর্ণধার। তিনি ছিলেন একজন রাজকীয় এবং বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিতে যেমন ব্যবসা, ব্যাংক, বীমা ও শিল্প স্থাপনে তিনি ছিলেন একজন ঈষার্ণীয় সফল ব্যক্তিত্ব। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

 

রাজনৈতিক জীবনে অবদানঃ

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আওয়ামী লীগে ১৯৬৭ সালে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। 

 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অবদানঃ

 

১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তাঁর পাথরঘাটাস্থ জুপিটার হাউস থেকে সংগ্রাম কমিটির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামে আসার পর জুপিটার হাউস থেকে সাইকোস্টাইল করে প্রচার করা হয়। তাঁর বাসা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ সব জায়গায় পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভারতে যান এবং সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। তিনি প্রথমে লন্ডনে যান। সেখান থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে আমেরিকায় যান। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হন এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধানের অন্যতম স্বাক্ষরকারী।

 

                 

মুজিব হত্যার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ভূমিকাঃ

 

১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং পরবর্তী সময়ে দলের পুনরুজ্জীবন ও পুনর্গঠনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। ক্রমেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের একজন অভিভাবক।

 

আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু  বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি কারা নির্যাতন ভোগ করেন।

 

ব্যবসাক্ষেত্রে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর অবদানঃ

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু শুধু রাজনীতিক নয়,একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মুখপাত্র ও ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দুই দফায় চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট এবং ১৯৮৮ সালে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠক এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি ৭৭ জাতি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি, যিনি এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ।

 

স্বাধীনতার পূর্বে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বাটালী রোডে রয়েল ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে তিনি বড় ভাইয়ের কারখানাগুলোও দেখাশোনা করতেন। পরবর্তীতে আখতারুজ্জামান বাবু আসিফ স্টিল মিল, জাভেদ স্টিল মিল, আসিফ সিনথেটিক, প্যান আম বনস্পতি, আফরোজা অয়েল মিল, বেঙ্গল সিথেটিক প্রোডাক্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ভ্যানগার্ড স্টিল মিল, সিনথেটিক রেজিন প্রোডাক্ট ক্রয় করে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রথম দু’দশকে জামান শিল্পগোষ্টির গোড়াপত্তন করেন। তিনি বিদেশী মালিকানাধীন আরামিট মিল ক্রয় করে সেটিকে সুদৃঢ় ভিত্তিক উপর দাঁড় করান।

 

বাংলাদেশ বেসরকারি ব্যাংকিং সেক্টর প্রতিষ্ঠায় আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশে দ্বিতীয় প্রাইভেট ব্যাংক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের (ইউসিবিএল) উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ২০১১ সালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পুনর্নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন।  

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মৃত্যুতে শূণ্যতার ছায়াঃ

 

 আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগকে শুধু অভিভাবকহীন করেনি, সামগ্রিক রাজনীতিতে একটি শূণ্যতা সৃষ্টি করেছে। যদিও তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, তবুও তিনি আমাদের অন্তরে চির জাগ্রত।  তিনি অমর, দীপ্তময়, আরো বেশি জনপ্রিয়।আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর সঞ্চয় ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বে থেকে গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন তিনি। 

 

জনপ্রিয়তার মূখ্য কারণঃ

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু সমস্ত লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়  অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে নির্মাণের সম্মুখ সৈনিক ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা উত্তরকালের সেই সব বিরল রাজনীতিবিদদের অন্যতম যারা আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে হাল ধরেছেন, রাজনীতি করেছেন নিজের অর্থ ব্যয় করে। ত্যাগ এবং সংগ্রামের মাধ্যমে অতিবাহিত হওয়া জীবনকে আদর্শ হিসেবে যদি ধরা যায়, তাহলে জীবনে সফলতা আসবেই। আর এমন একটি জীবনই অতিবাহিত করেছেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। আসলে সব মানুষই জীবনে নিজ নিজ ক্ষেত্র গড়ে তোলে আপন আপন ভুবন। আর যার কর্মে কীর্তিতে, মেধায়, মননে, স্নেহ, ভালোবাসায় ও সখ্যতায় অনন্য স্বাক্ষর রেখে যায়। তারা সারাজীবন ধরে তৈরি করে এক একটি বিচিত্র ও বর্ণিল অনন্য পৃথিবী। 

 

যাদের জীবন শুধু সংগ্রামের, ত্যাগের, যারা দিতে জানে বিনিময়ে কিছু নিতে জানে না প্রকৃত অর্থে তারাই মানুষ, যাদের অনুসরণ করলে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়, সে রকম একজন মহাপুরুষ আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। কেবল রাজনীতিই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পায়নের মাধ্যমেও দেশের মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন তিনি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশের বেকারত্ব হ্রাসে সহায়তা করেছেন।

 

 

Add Your Comment