আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আলোকিত এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

আলহাজ্ব বোরহান উদ্দিন চৌধুরী মুরাদ

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বনেদী ও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, একজন দেশ বরেন্য শিল্পপতি, দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করার পরও নিজেকে একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছ্ন্দ্যবোধ করতেন না, দেশে ও মানুষকে ভালবাসতেন বিধায় তিনি একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশী স্বাচ্ছ্ন্দ্যবোধ করতেন। তাঁর কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। জীবন আমার ধন্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মত এত বড় মাপের মহৎ হৃদয়বান জাতীয় নেতার সহচার্য লাভের আমার সুযোগ হয়েছে। তাঁর সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর বর্নাঢ্য জীবন বিশ্লেষণ করা, তাঁর মত এত বড় মাপের নেতা সম্পর্কে বলার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু তাঁর সাথে থেকে তাকে নিবিড়ভাবে দেখেছি, মিশেছি সুখ দুঃখের সাথী হয়েছি, যা কিছু শিখেছি, দেখেছি তা আমাকে অভিভূত করেছে। বিশাল হৃদয়ের অধিকারী এই জননেতা সকল মানুষের বিপদে আপদে দরদী হৃদয় নিয়ে এগিয়ে আসতেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। যার ব্রত ছিল মানব কল্যাণ, আল্লাহ মানুষকে শ্রেষ্ঠ করেছেন মানব কল্যানের জন্যই। তিনি আমৃত্য তাই করেছেন। দলের দুঃসময়ে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে তার সরব উপস্থিতি প্রতিটি নেতাকর্মীর মাঝে প্রাণ সঞ্চার করত, দুর্দিনে সময়ের প্রয়োজনে তিনি কখনো নির্লিপ্ত থাকেনি। বৃহত্তর চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতির অভিভাবক আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর স্মৃতি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু চট্টগ্রামের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নানা ঝড়ঝপ্টার মাঝেও দলীয় আদর্শে তিনি ছিলেন অবিচল, দলীয় নেতা কর্মীদের নিকট হয়ে উঠেছিলেন বড় অবলম্বন। কেবল রাজনীতিই নয়, ব্যবসা বাণিজ্য এবং শিল্পায়নের মাধ্যমেও দেশের মাঠি ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন তিনি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশের বেকারত্ব হ্রাসে সহায়তা করেছেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বহু বছর ধরে সক্রিয় ছিলেন চট্টগ্রামের রাজনীতিতে। দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি। আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন চারবার। নবম জাতীয় সংসদে তিনি ছিলেন পাট বস্ত্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। ১৯৪৫ সালে আনোয়ারা হাইলধর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন আখতারুজ্জামান চৌধুলী বাবু। তাঁর পিতার নাম নুরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন আইনজীবী এবং জমিদার। তাঁর মাতার নাম খোরশেদা বেগম। তিনি বাংলাদেশের সনামধন্য শিল্পপতি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর উপজেলার মরহুম আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দ্বিতীয় কন্যা নুর নাহার জামান এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৫৮ সালে পটিয়া হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ঐ বছরই ঢাকা নটরডেম কলেজে ভর্তি হন। ইন্টারমিডিয়েট কাসে পড়ার সময় তিনি বৃত্তি পেয়ে আমেরিকার ইলিনয় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে ভর্তি হন। পরে তিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে বিজসেন এডমিনিষ্ট্রেশনে পড়াশোনা করেন। ওখান থেকে এসোসিয়েট ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরেন। তিনি ১৯৬৫ সালে ব্যবসা শুরু করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৫৮ সালে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে তিনি মূল সংগঠন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হন। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তাঁর পাথরঘাটাস্থ জুপিটার হাউজ থেকে সংগ্রাম কমিটির কর্মকান্ড পরিচালিত হত। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামের আসার পর জুপিটার হাউস থেকে সাইকোস্টাইল করে প্রচার করা হয়। তাঁর বাসা থেকে  স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ সব জায়গায় পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভারতে যান এবং সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের ত্রান ও পূর্ণবাসন কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। তিনি প্রথমে লন্ডনে যান। সেখান থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে আমেরিকায় যান। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হন এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ণে ভুমিকা রাখেন। তিনি ৭২ সালের সংবিধানের অন্যতম স্বাক্ষরকারী।

স্বাধীনতার পর ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ২০০৮ সালে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ৭৫ সালে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং পরবর্তীতে দলের পুনরুজ্জীবন ও পুর্নগঠনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বলিষ্ট ভূমিকা রাখেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি কারা নির্যাতন ভোগ করেন। কেবল রাজনীতিই নয়, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পদ্যোক্তা ছিলেন। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি বাটালি রোডে বয়েল ইন্ডাষ্ট্রি নামে একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আসিফ ষ্টিল মিল, জাভেদ ষ্টিল মিল, আসিফ সিনথেটিক, প্যানআম বনস্পতি, আফরোজা অয়েল মিল, বেঙ্গল সিনথেটিক প্রোডাক্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ভ্যানগার্ড ষ্টিল মিল, সিনথেটিক রেজিন প্রোডাক্ট ক্রয় করে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রথম দু’দশকে জামান শিল্পগোষ্ঠীর গোড়াপত্তন করেন। তিনি বিদেশি মালিকানাধীন আরমিট মিল ক্রয় করে সেটিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। বাংলাদেশ বেসরকারি ব্যাংকিং সেক্টর প্রতিষ্ঠায় তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশে দ্বিতীয় প্রাইভেট ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) এর উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি ২০১১ সালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পুননির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মুখপাত্র ও ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দু’দফায় চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৮৮ সালে তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠক এফবিসিসিআইর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওআইসিভুক্ত দেশ সমূহের চেম্বারের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি ৭৭ জাতি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশী যিনি এই মর্যাদাপূর্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ব্যক্তি জীবনে ৩ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের জনক। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একজন সমাজহিতৈষী, দানবীর ও জনদরদী ছিলেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি হাইলধর ইউনিয়ন  পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বাধীনতার পরেও তিনি হাইলধর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং থানা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়ার বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও বহু জনহিতকর কাজের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজ জীবনেও আচার-আচরণ ছিল আলোকিত মানুষের। সামাজিক ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং রাজনৈতিক ভেদাভেদের পরিনীতির উপরে। তাঁর ব্রত ছিল মূলত মানবতাবোধে উদ্দীপ্ত। তার কাছে রাজনীতি ছিল বৃহত্তর মানব কল্যাণের মাধ্যম। মমত্ববোধ, মৈত্রী ও সমঝোতার অন্বেষণে তার প্রয়াস ছিল অক্লান্ত। সাংঘর্ষিক ও সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল দৃঢ় অথচ নম্র ও শান্ত।

তিনি বনেদী ও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান ও দেশের স্বনামধন্য শিল্পপতি হয়ে ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকাকে সমুন্নত রাখতে সাধারণ মানুষের রাজনীতিতে আমৃত্যু সম্পৃক্ত ছিলেন।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, তবুও তিনি আমাদের অন্তরে চির জাগ্রত। আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি, তার স্মৃতি, অর্থপূর্ণ জীবন ও লালিত মূল্যবোধ।

তাঁর আদর্শকে অন্তরে ধারণ করে প্রতিনিয়ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণে আমাদেরকে পথ চলতে হবে। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মত ত্যাগী নেতার আজ বড়ই প্রয়োজন। তিনি সারা জীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে আওয়ামী পরিবারে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা কখনো পূরণ হবার নয়।

 

আলহাজ্ব বোরহান উদ্দিন চৌধুরী মুরাদ,

সাবেক একান্ত সচিব

মরহুম আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এম.পি

০১৮১৭৪৯২৬৬

 

 

 

 

Add Your Comment